দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ না হলে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক। ফলে ওই সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও আসামির বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে কোনো আইনি বাধা নেই।
মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেল বনাম রাষ্ট্র মামলায় এ রায় দেন হাইকোর্ট। ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৩ সালের ৭ জুন এ রায় দেন।
সম্প্রতি রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ট্রাইব্যুনাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও কোনো অবস্থাতেই ওই মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করা যাবে না। ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার যে সময়সীমা আইনে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশনামূলক।
আদালত আরও বলেন, আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে বিচারিক প্রক্রিয়া বাতিল বা স্থগিত হওয়ার মতো কোনো পরিণতির বিধান রাখা হয়নি। তাই শুধু ১৮০ দিনের সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার কারণে মামলার বিচার অকার্যকর হয়ে যাবে না।
আদালতে পাভেলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম. এইচ. রশীদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. শফিকুজ্জামান (রানা)। মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরী।
প্রকাশিত রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, কলেজে যাওয়া-আসার সূত্রে পাভেলের সঙ্গে ইডেন কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ২০ বছর বয়সী এক ছাত্রীর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। ২০০৭ সালের ৮ জুলাই পাভেলের সঙ্গে একটি বাসায় যাওয়ার পর বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ওই ছাত্রীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পরে পাভেল তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন এবং এতে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন বলে অভিযোগ করা হয়। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাকে জোরপূর্বক গর্ভপাত করানো হয় বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়।
ওই ঘটনায় ২০০৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর শ্যামপুর থানায় পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগীর মা। তদন্ত শেষে পুলিশ মো. সাইফুল ইসলাম ওরফে পাভেলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকার ১ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২০০৮ সালের ২৩ জুলাই আদালত পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। তবে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
পরবর্তীতে পাভেল ২০১১ সালের ৮ মে হাইকোর্টে রিট করেন। তার দাবি ছিল, বিচারের জন্য মামলার নথি ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই ট্রাইব্যুনালে নথিভুক্ত হওয়ার পরও নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হয়নি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারা অনুযায়ী, মামলা গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পাভেল আরও দাবি করেন, ২০০৮ সালের ১৩ জুলাই মামলার নথি ট্রাইব্যুনালে গৃহীত হলেও ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারির ৩৪ নম্বর আদেশ থেকে দেখা যায়, মামলাটি তখনও বিচারাধীন ছিল। তার দাবি ছিল, এটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ক ধারার লঙ্ঘন।
এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হলে ৩১ক ধারা অনুযায়ী বিচার শেষ না হওয়ার কারণ উল্লেখ করে ৩০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল, পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধান রয়েছে। ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি বলেও রিটে উল্লেখ করেন পাভেল।
বিচার কার্যক্রম স্থগিতের আবেদনের পর হাইকোর্ট মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে ওই স্থগিতাদেশ বিভিন্ন সময়ে বাড়ানো হয়।
পরবর্তীতে উভয় পক্ষের যুক্তি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ও ৩১ক ধারা পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট পাভেলের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দেন।
রায়ে আদালত বলেন, মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন নয় এবং রিটকারী পরবর্তী সময়ের কিছু আদেশ গোপন করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে এটিকে রিটকারীর অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণোদিত কাজ বলে উল্লেখ করা হয়। সার্বিক তথ্য-প্রমাণ, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও আইনের বিধান বিবেচনায় রুলের কোনো সারবত্তা নেই উল্লেখ করে তা খারিজ করেন আদালত। একই সঙ্গে আগের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়।
এমএম/